⚖️ আইন মূলত আইনবিজ্ঞান থেকে আলাদা
- Author: Siam Al Mahmud Administrator
- Published: 11 hours ago
- Category: আইনবিজ্ঞান (Jurisprudence)
-
ব্যকরণের সাথে ভাষার যেমন সম্পর্ক তেমনি আইনের সাথে আইনবিজ্ঞানের সম্পর্ক। ভাষাকে ভালোভাবে শিখতে হলে যেমন ব্যকরণ জানতে হয়, তেমনি আইনকে ভালোভাবে জানতে হলে আইনবিজ্ঞান পাঠ করতে হয়। এজন্য বলা যায়, আইনের বিষয় যেমন বড় আইনবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু তেমনই বড়। এজন্য কার্ল লিউলিন বলেছেন, "আইন বিজ্ঞান আইনের মতই বড় এবং একটু বেশীই বড়।" কারণ, আইন হলো সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহীত ও প্রয়োগকৃত বিধি বিধানসমূহ। আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্র শুধুমাত্র কোন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ থাকলেও আইনবিজ্ঞানের প্রয়োগক্ষেত্র বিশ্বব্যপী।
আইন রাষ্ট্রের মধ্যে নাগরিকদের অধিকার সম্পর্কে আলোচনা করে, কিন্তু আইনবিজ্ঞান রাষ্ট্রের মধ্যে নাগরিকদের অধিকার নিয়ে যেমন আলোচনা করে তেমনি বিশ্বের সকল মানুষের অধিকার নিয়েও আলোচনা করে। তাছাড়া আইনবিজ্ঞান আইন কাঠামো পরিবর্তনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে থাকে, কিন্তু আইন কখনও আইন কাঠামো পরিবর্তনের কথা বলে না। নির্দিষ্ট আইন তার নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করে, কিন্তু আইনবিজ্ঞান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। অধ্যাপক এ্যালেন (Prof. Allen) বলেছেন যে, "আইনবিজ্ঞান হলো বিশ্বের সমগ্র আইনের মূলনীতিসমূহের বৈজ্ঞানিক সমন্বয়।" আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করে আইনবিজ্ঞানী প্যাটন বলেছেন যে, "আইনবিজ্ঞান কেবলমাত্র একটি দেশের আইনের বিশেষ পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করে না, ইহা সমগ্র বিশ্বের আইনের সাধারণ পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করে।"
মৌলিকগতভাবে আইনবিজ্ঞানের সাথে আইনের যথেষ্ট ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। আইন ও আইনবিজ্ঞানের দুইটি পরস্পর বিরোধী ও আলাদা বিষয় ও যার শব্দগত অর্থও ভিন্নতর। আইন ও আইনবিজ্ঞানের ভিতর ভিন্নতাগুলো নিম্নরুপ-
(১) সংগাগত পার্থক্য: সাধারণ কথায় 'আইন' সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞানকে আইনবিজ্ঞান বলা হয়। অর্থাৎ যে বিদ্যা আইন সম্পর্কে বিভিন্ন জ্ঞান দান করে, উহাই আইনবিজ্ঞান। পক্ষান্তরে, আইন হলো সার্বভৌম রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আরোপিত মানুষের বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণের নিয়মাবলী।
(২) প্রয়োগ ক্ষেত্র: আইনবিজ্ঞানের প্রয়োগক্ষেত্র সমগ্র বিশ্বব্যাপী। অর্থাৎ এটা বিশ্বের আইনের সাধারণ রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করে। পক্ষান্তরে, আইনের প্রয়োগক্ষেত্র কেবলমাত্র কোন বিশেষ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। তাই আইনবিদ Paton বলেছেন, "Jurisprudence is a particular method of study, not of the law of one country, but of the general nation of law itself. It is a study relating to law."
(৩) বিষয়বস্তুগত পার্থক্য: আইনবিজ্ঞান আইন সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধান করে। পক্ষান্তরে, আইন নিজেই পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার বিষয়বস্তু।
(৪) বিজ্ঞানের শাখা: আইনবিজ্ঞানকে বিজ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে অভিহিত করা হয়। পক্ষান্তরে, আইনকে কোন বিজ্ঞানের শাখা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় না।
(৫) অধিকার সৃষ্টি: আইনবিজ্ঞান কোনরূপ অধিকার সৃষ্টি করেনা। পক্ষান্তরে, আইন হলো এমনই এক ধরনের বিধি যা কোন না কোন অধিকার ও বাধ্যবাধকতার সৃষ্টি করে থাকে।
(৬) উদ্দেশ্যগত পার্থক্য: আইনের মূলনীতি পর্যালোচনা ও আইনের ব্যবহৃত শব্দমালার ব্যাখ্যা প্রদান করাই আইনবিজ্ঞানের মূল লক্ষ্য। পক্ষান্তরে, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন তথ্যা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করাই আইনের মূল লক্ষ্য।
(৭) আইন কাঠামো পরিবর্তনে: আইনবিজ্ঞান আইন কাঠামো পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে থাকে। পক্ষান্তরে, আইন উল্লেখিত ক্ষেত্রে প্রবেশ করে না। অর্থাৎ আইনের পরিধি এসব ক্ষেত্রে বিস্তৃত নয়।
(৮) উৎপত্তিগত পার্থক্য: আইন সম্পর্কীয় বিশেষ জ্ঞান হতে আইনবিজ্ঞানের উৎপত্তি ঘটেছে। পক্ষান্তরে, মানুষের বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার সুমহান উদ্দেশ্যে সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আইনের উৎপত্তি ঘটেছে।
(৯) বলবৎ হবার প্রশ্নে: আইনবিজ্ঞানের সকল নীতিমালাগুলিকে আদালতকর্তৃক বলবৎ করা যায় না। পক্ষান্তরে, যে কোন দেশের প্রচলিত আইনকে আদালত কর্তৃক বলবৎ করা যায়।
(১০) প্রকৃতিগত পার্থক্য: আইনবিজ্ঞান হলো আইনের মৌলিক উপাদানগুলির বৈজ্ঞানিক আলোচনা। পক্ষান্তরে, আইন হলো তথ্য ভিত্তিক ও বাস্তবতার সাথে সম্পর্কযুক্ত।
(১১) সৃষ্টিগত পার্থক্য: আইনবিজ্ঞান কোন সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সৃষ্ট নয়। পক্ষান্তরে, আইন হলো মানুষের বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্র কর্তৃক সৃষ্ট ও প্রয়োগকৃত কতকগুলি বিধি।
স্যার জন স্যালমন্ড আইনের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, "আইন হলো রাষ্ট্র দ্বারা স্বীকৃত ও কতিপয় স্বাধীন তথ্যাবিশেষ।" অপরদিকে আইনবিজ্ঞানের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, "আইনবিজ্ঞান হলো রাষ্ট্রীয় অথবা বেসামরিক দেওয়ানী আইনের প্রথম সূত্র কিংবা মৌলিকনীতির বিজ্ঞান।" আইনবিজ্ঞানের উৎপত্তি হয়েছে আইন সম্পর্কিত বিশেষ জ্ঞান থেকে। অন্যদিকে আইনের সৃষ্টি ঘটে আদালত দ্বারা স্বীকৃত ও অনুসৃত নিয়মাবলীর দ্বারা। আইন অধিক তথ্যভিত্তিক বাস্তবতার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ার অনুকুলে অভিমত প্রকাশ করে। বৈধভাবে স্বীকৃতি লাভের জন্য আইনের যাবতীয় নিয়মকানুনগুলি অবশ্যই তথ্যভিত্তিক অথবা বিজ্ঞানসম্মত হতে হবে। অন্যদিকে আইনবিজ্ঞানে আইনের মৌলিক উপাদানসমূহ হচ্ছে বৈজ্ঞানিক বিন্যাস। আইন ও আইনবিজ্ঞানের মধ্যে সাদৃশ্যগত দিক হলো উভয়ই তথ্যভিত্তিক উপাদানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে উপরিউক্ত আলোচনা হতে স্পষ্টতই বুঝা যায় যে, আইনবিজ্ঞান আইন হতে পৃথক। অর্থাৎ আইন হলো একটি শাস্ত্র বা বিদ্যা। কিন্তু আইনবিজ্ঞান হলো যে কোন আইনশাস্ত্রের মৌলিক তথ্য।