⚖️ আইনের উৎস

  • Author: Siam Al Mahmud Administrator
  • Published: 18 hours ago
  • Category: আইনবিজ্ঞান (Jurisprudence)

'আইনের উৎস' কথাটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আইন সম্পর্কে সঠিক ও সম্যক ধারণা লাভের জন্য এর উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। সাধারণ অর্থে উৎস বলতে উৎপত্তিস্থল বুঝায় অর্থাৎ আইনের উৎস বলতে বুঝায় আইন কোথা হতে সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক ক্রমবিকাশের বিভিন্ন গতিপথে আইনের উৎপত্তি, উন্নয়ন ও আইনের ভিত্তির তারতম্যের জন্য আইনবিশারদগণ স্ব স্ব চিন্তা-ভাবনা থেকে আইনের উৎসের বর্ণনায় বিভিন্ন মতবাদ পোষণ করে থাকেন। কেউ সমাজের গতিবিধিকে আইনের উৎস বলে অভিহিত করেন। আবার কারো মতে আইনের উৎস বলতে সার্বভৌম ক্ষমতা বা রাষ্ট্রকে বুঝায়। কেননা এখান থেকেই আইন শক্তি বা বৈধতা লাভ করে। কেউবা সার্বভৌমের ইচ্ছাকে আইনের উৎস হিসেবে বর্ণনা করেন। এসকল উৎসগুলির কতকগুলি বাধ্যতামূলক এবং কতকগুলি বাধ্যতামূলক নয়। আইনের স্বীকৃত এসকলই বাধ্যবাধকতার মানদন্ড বা ভিত্তি হিসেবে অভিহিত হয়। প্রকৃতপক্ষে, আইনের বৈধতা (Validity of law) যাচাই ও বিবেচনা করার উদ্দেশ্যেই আইনের উৎসের প্রতি এরুপ গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

'আইনের উৎস' সম্পর্কে বিভিন্ন আইনবিদগণ বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন। যেমন-

১। প্রখ্যাত আইনবিজ্ঞানী গারভিচ (Gurvitch) বলেন যে, আইনের বৈধতা বিবেচনা করাই হলো আইনের উৎস নিরূপণের একমাত্র উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, আইনের উৎস সম্পর্কে গুরুত্ব আরোপ করার একমাত্র কারণ আইনের প্রকৃতি নির্ণয় করা নয়, মূলত আইনের বৈধতা বিচার করাই এর প্রধান উদ্দেশ্য।

২। John Austin 'আইনের উৎস' কথাটি তিন প্রকার অর্থে ব্যবহার করেছেন।

প্রথমত- তিনি কোন দেশের সার্বভৌম ক্ষমতাকে আইনের উৎস হিসেবে অভিহিত করেছেন।

দ্বিতীয়ত- তিনি ঐতিহাসিক দলিলকে আইনের উৎস হিসেবে গণ্য করেছেন। কারণ এখান থেকে আইন সম্পর্কে জানা যায়।

তৃতীয়ত- তিনি ঐসকল ঘটনাকে আইনের উৎস হিসেবে গণ্য করেছেন, যা হতে কোন বিধি আইনের মর্যাদা লাভ করে। যেমন- প্রথা।

৩। Prof. Keeton এর ভাষায়, "The term 'Sources of law' implies the material out of which law is eventually fashioned through the activities of judges". অর্থাৎ, আইনের উৎস বলতে ঐ সকল বিষয়বস্তুকে বুঝায় যার মাধ্যমে বিচারকগণ আইন সৃষ্টির প্রয়াস পায়।

৪। Oppenheim এর ভাষায়, "The source of law is meant a historical fact out of which the rules of conduct rise into existence and acquire legal force". অর্থাৎ, আইনের উৎস হলো একটি ঐতিহাসিক ঘটনা যার দ্বারা আচরণবিধি সৃষ্টি হয় এবং আইনের শক্তি অর্জন করে।

৫। Prof. Markby এর মতে, "The source of law is meant simply the place where if a man wants to get at the law, he must go for it". অর্থাৎ, আইনের উৎস বলতে আইনের উৎপত্তিস্থলকে বুঝায়, যেখান হতে মানুষ আইনের প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করতে পারে।

৬। Prof. Allen এর মতে, "The sources of law connote those agencies by which rules of conduct acquire the character of law by becoming definite, uniform and compulsory". অর্থাৎ, যে সকল এজেন্সির মাধ্যমে আচরণবিধি আইনের মর্যাদা লাভ করে এবং নির্দিষ্ট, একইরূপ ও বাধ্যকরী শক্তি অর্জন করে, উহাই আইনের উৎস।

অপরদিকে, স্বাভাবিক আইনের (Natural Law) প্রবক্তাগণ সৃষ্টিকর্তাকেই 'আইনের উৎস' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁদের মতে, "Every law is the gift of God and the decision of the sages". এছাড়া, সমাজতান্ত্রিক আইনের প্রবক্তাগণ সমাজকেই আইনের একমাত্র উৎস হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত আইনবিদ Ehrlich বলেন যে, "The centre of gravity of legal development lies in society itself".

উপরিউক্ত সংজ্ঞাগুলি বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায়, যে সকল বাস্তব ঘটনা হতে মানুষের আচরণবিধির উদ্ভব হয় এবং যা অবশ্যই পালনীয় বলে গণ্য করা হয়, তাই 'আইনের উৎস' (Source of law)। উল্লেখ্য যে, আইনের বৈধতা বিবেচনা করার উদ্দেশ্যেই আইনের উৎসের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়। তবে, আইনের উৎসগুলির মধ্যে সবগুলোই বাধ্যতামূলক নয়। আইন ও আদালত কর্তৃক স্বীকৃতপ্রাপ্ত সকল উৎসই বাধ্যতামূলক। যেমন- সংবিধান প্রণীত আইন স্বীয় দেশের বিচার বিভাগীয় পূর্ব-দৃষ্টান্ত ইত্যাদি বাধ্যতামূলক উৎস। কিন্তু প্রথা, ধর্মীয় অনুশাসন, বিদেশি আদালতের পূর্ব সিদ্ধান্ত, প্রখ্যাত আইনবিদদের প্রণীত গ্রন্থসমূহ বাধ্যতামূলক উৎস নয়। আদালত এগুলি বিবেচনা করেন বটে তবে তা গ্রহন করতে বাধ্য থাকেন না।